আর্কাইভ  শুক্রবার ● ২৪ এপ্রিল ২০২৬ ● ১১ বৈশাখ ১৪৩৩
আর্কাইভ   শুক্রবার ● ২৪ এপ্রিল ২০২৬

শিরোনাম: ঢাবিতে অনলাইন ক্লাস       নিয়ম ভেঙে রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে রেজিস্ট্রার নিয়োগ, অনিয়মেই বাড়লো মেয়াদ       ৪৭তম বিসিএসের লিখিত পরীক্ষার সিট প্ল্যান ও নির্দেশনা প্রকাশ       বিয়ে করলেই নাগরিকত্ব পাওয়া যায় যেসব দেশের       ২দিন ছুটিসহ পপুলারে চাকরি      

দেশে জনপ্রিয় হচ্ছে স্মার্ট লেনদেন

বুধবার, ১১ অক্টোবর ২০২৩, দুপুর ১০:২১

খাদিজা আক্তার

গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের ছাত্রী বিপাশা পড়েন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। থাকেন রোকেয়া হলে। প্রতি মাসে পরিচিত কারোর মাধ্যমে বড় ভাই টাকা পাঠান তার কাছে। তাই দিয়ে চলে তার লেখা পড়া ও আনুষঙ্গিক খরচ। বললেন ‘প্রতি মাসেই টাকা পেতে ঝামেলা হবে। তাই ভাইয়াকে বলেছি মোবাইলে টাকা পাঠাতে।’

নগদ টাকা বহনের ঝামেলা কমিয়ে দিয়ে দেশের অভ্যন্তরীণ নানামুখী ডিজিটাল লেনদেন বা স্মার্ট লেনদেন বেশ জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। এমএফএসের (মোবাইলে আর্থিক সেবা) কারণে বিপাশার মতো অনেক সাধারণ মানুষও ডিজিটাল লেনদেনে অভ্যস্ত হয়ে উঠেছে। মুঠোফোনই হয়ে উঠছে তাদের কাছে লেনদেনের বড় মাধ্যম। এমনকি কেনাকাটা, মোবাইল রিচার্জ, পরিসেবা বিল পরিশোধ সবই হচ্ছে ডিজিটাল মাধ্যমে।

ডেবিট ও ক্রেডিট কার্ডে কেনাকাটা, মোবাইলে আর্থিক সেবা (এমএফএস), ইন্টারনেট ব্যাংকিং, অ্যাপসে লেনদেন, ইলেকট্রনিক ফান্ড ট্রান্সফার, রিয়েল টাইম গ্রস সেটেলমেন্টসহ এমন নানামুখী ডিজিটাল লেনদেন জীবনে এনে দিয়েছে স্বাচ্ছন্দ্য। নগদ টাকা বহনের ঝামেলা কমিয়ে দিয়েছে। জীবনকে সহজ করে দিয়েছে। আর প্রতিটি লেনদেনে থাকছে ডিজিটাল রেকর্ড। যা প্রয়োজনমতো ব্যবহার করা যাচ্ছে। এখন কার্ডের পরিবর্তে অ্যাপস, কিউআর কোড ব্যবহার দিন দিন বাড়ছে। ব্যাংকগুলোর ডেবিট ও ক্রেডিট কার্ড এবং বিকাশ, রকেট, নগদ, উপায়, মাই ক্যাশ, ট্যাপের মতো এমএফএসের কারণে সাধারণ মানুষ ডিজিটাল লেনদেনে অভ্যস্ত হয়ে উঠেছে।

এসব ডিজিটাল মাধ্যমে লেনদেনের অংক ২০২৩ সালের জুন শেষে এক লাখ ৩২ হাজার ১৭৫ কোটি টাকা ছাড়িয়ে গেছে। সে হিসেবে দৈনিক লেনদেন হয়েছে ৪ হাজার ৪০৫ কোটি টাকারও বেশি। শুধু দিনে নয়, ২৪ ঘণ্টাতেই চলছে এসব লেনদেন। অনেক ক্ষেত্রে কারও সহায়তা ছাড়া গ্রাহকেরা নিজেই লেনদেন করতে পারছেন। যা জীবনকে আরও এগিয়ে দিচ্ছে।

গবেষণা ও নীতি সহায়ক সংস্থা ইনস্টিটিউট ফর ইনক্লুসিভ ফিন্যান্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের (আইএনএফ) নির্বাহী পরিচালক মুস্তফা কে. মুজেরি বলেন, একটি দেশে ডিজিটাল লেনদেন যত বেশি বাড়বে,আর্থিক স্বচ্ছতা তত নিশ্চিত হবে। যা বৈষম্য কমাতেও সাহায্য করে। ডিজিটাল সেবা ঘরে বসে নেওয়া যায়, ফলে বিশেষ সুবিধা কেউ পাবে না। তবে দেখতে হবে, এসব সেবায় মাশুল যেন বেশি না হয়। যাতে সবার নাগালের মধ্যে থাকে।’  

ডিজিটাল যত লেনদেন
ডিজিটাল লেনদেন বলতে বোঝায় কার্ড, ইন্টারনেট ব্যাংকিং, অ্যাপস ও এমএফএসকে। জানুয়ারিতে এমএফএসে এক লাখ কোটি টাকার বেশি লেনদেন হলেও ডিজিটাল লেনদেন হয়েছে সাড়ে ৭ হাজার কোটি টাকার। একইভাবে দেশের ডেবিট ও ক্রেডিট কার্ড দিয়ে জানুয়ারিতে ৩৯ হাজার ৭৫৭ কোটি টাকার লেনদেন হলেও প্রকৃত ডিজিটাল লেনদেন হয়েছে তিন হাজার ৮০০ কোটি টাকা। কারণ, কার্ড দিয়ে এটিএম বুথ থেকে নগদ টাকা বেশি উত্তোলন হয়। পয়েন্ট অফ সেলস ও ই-কমার্সে যে কেনাকাটা হয়, সেটাই প্রকৃত ডিজিটাল লেনদেন।

এদিকে ব্যাংকের গ্রাহকেরা ইন্টারনেট ব্যাংকিং সেবা ও অ্যাপস ব্যবহার করে মাসে ৩৩ হাজার ৯২৫ কোটি টাকা লেনদেন করছেন। এজেন্ট ব্যাংকিং সেবার মাধ্যমে প্রতি মাসে পরিসেবা বিল জমা হচ্ছে প্রায় ১০০ কোটি টাকা।


এত গেল ছোট লেনদেনের খবর। ইলেকট্রনিক ফান্ড ট্রান্সফারের মাধ্যমে প্রতি মাসে লেনদেন হচ্ছে প্রায় ৬২ হাজার কোটি টাকা। মূলত সরকারি বেতন ভাতা, এক হিসাব থেকে একাধিক হিসাবে টাকা পাঠানোসহ বিভিন্ন প্রাতিষ্ঠানিক লেনদেনে ইএফটি ব্যবহার হচ্ছে। ক্লিকেই টাকা চলে যাচ্ছে গ্রাহকের হিসাবে। এতে সরকারি ও বেসরকারি হিসাবে এসেছে স্বচ্ছতা।

এদিকে রিয়েল-টাইম গ্রোস সেটেলমেন্ট (আরটিজিএস) এর মাধ্যমে প্রতি মাসে ৪ লাখ ৯৩ হাজার কোটি টাকা লেনদেন হচ্ছে। এটি হলো একটি বিশেষ ধরনের লেনদেন মাধ্যম যেখানে বাংলাদেশের একটি ব্যাংক থেকে অন্য ব্যাংকে একসঙ্গে অনেক টাকা স্থানান্তর করা হয়। আরটিজিএস লেনদেনে সর্বনিম্ন পরিমাণ হলো এক লাখ টাকা।

চেক থেকে কার্ড, কার্ড থেকে অ্যাপস
বর্তমানে দেশে ৪০টির মতো ব্যাংক ক্রেডিট কার্ড সেবা দিচ্ছে। এর মধ্যে প্রায় সবাই ভিসা ও মাস্টারকার্ড ব্র্যান্ডের মাধ্যমে কার্ড সেবা দিচ্ছে। তবে এর বাইরে কয়েকটি ব্যাংক কার্ড সেবাকে অভিনবত্ব দিতে অন্য ব্র্যান্ডের কার্ডও এনেছে। সিটি ব্যাংক এমেক্স কার্ড, প্রাইম ব্যাংক জেবিসি কার্ড, ইস্টার্ন ব্যাংক ডিনার্স ক্লাব কার্ড, ডাচ-বাংলা ব্যাংক নেক্সাস পে কার্ড ও মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংক ইউনিয়ন পে ইন্টারন্যাশনালের সেবা দিচ্ছে।

এসব কার্ড দিয়ে এটিএম ও পয়েন্ট অফ সেলসে লেনদেন করা যাচ্ছে। এখন ব্যাংকগুলো নিয়ে এসেছে নিজস্ব অ্যাপস। ফলে কার্ডের দিনও শেষ হয়ে আসছে কিনা, এই প্রশ্ন উঠছে। এসব অ্যাপস বেশ জনপ্রিয়তা পেয়েছে। এর মাধ্যমে গ্রাহকেরা কারও সহায়তা ছাড়া টাকা স্থানান্তর, বিল পরিশোধ, কেনাকাটা, পরিসেবা বিল পরিশোধসহ নানা লেনদেন করছেন। ইসলামী ব্যাংকের সেলফিন, ডাচ বাংলার নেক্সাস পে, সোনালী ব্যাংকে ই-সেবা, সিটি ব্যাংকের সিটি টাচ, ব্র্যাক ব্যাংকের আস্থা, ইস্টার্ন ব্যাংকের ইবিএলস্কাই ব্যাংকিং, স্ট্যান্ডার্ড ব্যাংকের এসসি মোবাইল অ্যাপ এখন বেশ জনপ্রিয়। এছাড়া বিকাশ ও নগদ অ্যাপস এখন মানুষের মোবাইলে মোবাইলে। এসব অ্যাপস ছাড়া এখন অনেকের জীবনই অচল।  

বেসরকারি খাতের মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ মাহবুবুর রহমান বলেন, ধীরে ধীরে সব ধরনের লেনদেন ডিজিটাল হয়ে যাচ্ছে। কার্ড, অ্যাপস, এমএফএসের ব্যবহার বাড়ছে। এতে নগদ টাকার ব্যবহার কমে আসছে। ডিজিটাল লেনদেন মানুষের জীবনকে সহজ করে দিচ্ছে, স্বাচ্ছন্দ্যও এনে দিচ্ছে।

বিভিন্ন ডিজিটাল সেবার অব্যাহত জনপ্রিয়তা বৃদ্ধির পাশাপাশি মোবাইল মানি সেবা বিশ্বজুড়ে ধারণা বা পূর্বাভাসের চেয়ে দ্রুতগতিতে বাড়ছে। সম্প্রতি প্রকাশিত জিএসএমএর বার্ষিক প্রতিবেদনে (স্টেট অব দ্য ইন্ডাস্ট্রি রিপোর্ট অন মোবাইল মানি ২০২৩) এ কথা জানানো হয়েছে। বিল অ্যান্ড মেলিন্ডা গেটস ফাউন্ডেশনের অর্থায়নে জিএসএমএ প্রতি বছর এই প্রতিবেদন প্রকাশ করে। এতে দেখা যাচ্ছে, মোবাইল মানি সেবা গ্রহণের হার প্রত্যাশার চাইতে এখন অনেক বেশি এবং বার্ষিক নিবন্ধিত মোবাইল মানি অ্যাকাউন্টের সংখ্যা ১৩ শতাংশ বেড়েছে। ২০২১ সালে বিশে^ যেখানে ১৪০ কোটি মোবাইল মানি অ্যাকাউন্ট ছিল, তা বেড়ে ২০২২ সালে ১৬০ কোটিতে পৌঁছায়। প্রথম ৮০ কোটি গ্রাহক পেতে এ খাতের ১৭ বছর লেগেছে, কিন্তু পরবর্তী ৮০ কোটি গ্রাহক পেতে মাত্র পাঁচ বছর সময় লাগার বিষয়টি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ।

২০২২ সালে মোবাইলে আর্থিক লেনদেনের পরিমাণ দৈনিক ৩৪৫ কোটি মার্কিন ডলারে পৌঁছায়, আগের বছর ২০২১ সালে যা ৩০০ কোটি হবে বলে আভাস দেয়া হয়েছিল। মোবাইল মানি লেনদেনের মোট মূল্যমান ২০২১ এবং ২০২২ সালের মধ্যে অবিশ্বাস্যভাবে ২২ শতাংশ বেড়েছে। ১ লাখ কোটি থেকে এটি প্রায় ১ লাখ ২৬ হাজার কোটিতে পৌঁছেছে। এভাবে সারা বিশে^ই ডিজিটাল লেনদেন জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। অচিরেই এমন দিন আসবে যখন কোন চেক বা কার্ড নয় বরং বিভিন্ন আর্থিক অ্যাপসের মাধ্যমে গ্রাহক ঘরে বসেই সকল লেনদেন সম্পন্ন করবে। স্মার্ট বাংলাদেশ আমাদেরকে সে ইঙ্গিতই দিচ্ছে।

লেখক: সাংবাদিক

মন্তব্য করুন


 

Link copied