আর্কাইভ  সোমবার ● ২০ এপ্রিল ২০২৬ ● ৭ বৈশাখ ১৪৩৩
আর্কাইভ   সোমবার ● ২০ এপ্রিল ২০২৬

শিরোনাম: ঢাবিতে অনলাইন ক্লাস       নিয়ম ভেঙে রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে রেজিস্ট্রার নিয়োগ, অনিয়মেই বাড়লো মেয়াদ       ৪৭তম বিসিএসের লিখিত পরীক্ষার সিট প্ল্যান ও নির্দেশনা প্রকাশ       বিয়ে করলেই নাগরিকত্ব পাওয়া যায় যেসব দেশের       ২দিন ছুটিসহ পপুলারে চাকরি      

সমন্বয়ই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শক্তি

মঙ্গলবার, ২৮ অক্টোবর ২০২৫, দুপুর ১১:২৭

ইফতেখারুল ইসলাম

সমকালের এক প্রতিবেদনমতে, ২৩ অক্টোবর থেকে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন, মেট্রোরেল কর্তৃপক্ষ, শাহবাগ থানা, বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন ও ডাকসু মিলে সপ্তাহব্যাপী উচ্ছেদ অভিযান পরিচালনা করছে। এতে ডাকসু প্রতিনিধি ও প্রশাসনের বিরুদ্ধে কোনো কোনো হকার ও বিক্রেতাদের গায়ে হাত তোলার অভিযোগও পাওয়া গেছে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস থেকে ভাসমানদের উচ্ছেদকে কেন্দ্র করে সামাজিক মাধ্যমে বিতর্কও দেখা দিয়েছে। সমালোচকদের যুক্তি, কোনো ধরনের পুনর্বাসন ছাড়া ঢাবি প্রশাসন এ ধরনের পদক্ষেপ নিতে পারে না। পাল্টা যুক্তি হিসেবে ঢাবি প্রক্টর সাইফুদ্দীন আহমেদ জানিয়েছেন, কোনো ধরনের আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়া ছাড়া ক্যাম্পাসে থাকা হকার পুনর্বাসনের দায়িত্ব তাদের নয়। তা ছাড়া অপ্রকৃতস্থ, ভবঘুরে ও রিকশাওয়ালার হাতে ছাত্রীদের হেনস্তার অভিযোগও তুলেছেন অনেকে। ঘটনার ব্যাপারে যে ধরনের অভিযোগ উঠছে এবং প্রশাসন যেভাবে সমস্যার সমাধান করতে চায়, তার কোনোটাই কার্যকরী পরিকল্পনা বলে মনে হয় না। এর পেছনে বহু কারণ রয়েছে। 

প্রথমত, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস দেশের অন্যান্য পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বহু ক্ষেত্রে আলাদা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অবস্থান ও পরিবেশের সঙ্গে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় ও রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের মিল নেই। এসব প্রতিষ্ঠান শহর থেকে দূরে; আর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অবস্থান রাজধানীর কেন্দ্রে। প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসের সঙ্গে তুলনার তো প্রশ্নই আসে না। ফলে আর পাঁচটি বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে মিলিয়ে ফেলা যাবে না। 

দ্বিতীয়ত, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে যুক্ত সিটি করপোরেশন ও মেট্রোরেল কর্তৃপক্ষ। ক্যাম্পাসের ভেতর দিয়ে চলে গেছে পাবলিক রাস্তা, যেখান থেকে জনসাধারণ ও সাধারণ পরিবহন দিনরাত আসা-যাওয়া করে। আর সারাদেশের রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক আন্দোলনের প্রধান কেন্দ্রবিন্দু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়; অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো কেবল নিজস্ব ইস্যুতে আবদ্ধ নয়। গত একশ বছরে ঢাকা শহরের সব ভালো-মন্দ নিয়েই এখানকার ইকোসিস্টেম গড়ে উঠেছে। 

তৃতীয়ত, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে চতুর্দিকে বসবাসরত মানুষের একটা সংযোগ রয়েছে। ক্যাম্পাসের ভেতরের সড়ক দিয়ে আশপাশ এলাকা যুক্ত। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, শহরের পরিকল্পনা অত্যন্ত নগরবাসী-বিরোধী। বর্তমানে নগরবাসী যে জায়গায় গিয়ে একমুঠো নিঃশ্বাস নিতে পারে, তার মধ্যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় অন্যতম। বিশেষত ছুটির দিন– শুক্রবার ও শনিবার ক্যাম্পাসে গেলে উপলব্ধি করা যায় কতটা চাপ এ প্রতিষ্ঠানের চারপাশে পড়েছে। বাইরের মানুষের উপস্থিতিতে ক্যাম্পাস গিজগিজ করে। 

চতুর্থত, স্বীকার করতেই হবে, হকার, ভবঘুরে, বহিরাগত– সবকিছু মিলিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে এক রকম সমাজ গড়ে উঠেছে। বহু দিক থেকে এই পরিস্থিতি বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশের জন্য ইতিবাচক নয়। কিন্তু প্রশ্ন হলো, এই পরিবেশ পুনর্গঠনের জন্য আমরা কি বিকল্প ব্যবস্থা নিয়েছি? তা ছাড়া যে ব্যবস্থার কথা বলছি, তা বিশ্ববিদ্যালয়কে কতটা যথার্থই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে তুলবে? এই প্রশ্নগুলো বিবেচনায় না নিলে আমাদের সংস্কার প্রক্রিয়া যেমন প্রশ্নবিদ্ধ হবে, তেমনি যথেষ্ট ফল পাওয়াও সম্ভব হবে না।

এ অবস্থায় একমুখী পদক্ষেপ নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসের পুনর্গঠন সম্ভব নয়, বরং এমন এক উদ্যোগ নিতে হবে, যা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভারসাম্যপূর্ণ পরিস্থিতি টিকিয়ে রাখে। সমন্বয়ই এই বিশ্ববিদ্যালয়ের শক্তি। নিঃসন্দেহে সোহরাওয়ার্দী উদ্যান, মেট্রোরেলের আশপাশের পরিবেশ ক্যাম্পাসের পরিবেশও নষ্ট করে। সেখানকার হকার, ভবঘুরে, মাদকাসক্তদেরও ক্যাম্পাসে অবারিত যাতায়াত। ঢাবি প্রশাসন তাদের তাড়ানোর ব্যবস্থা করল বটে; এরপর তারা কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে? রাষ্ট্র তাদের ব্যাপারে কী পদক্ষেপ নেবে? ক্যাম্পাসে হকারদের প্রবেশ নিষিদ্ধ করলেও রিকশাওয়ালাদের প্রবেশ কি নিষিদ্ধ করতে পারবে? উভয় গোষ্ঠীই খেটে খাওয়া নিম্নবিত্ত শুধু নয়; ঢাবি শিক্ষার্থীদের প্রয়োজন ও পরিবহনের সঙ্গেও নিবিড়ভাবে যুক্ত। 

এ রকম একটা ধোঁয়াশাপূর্ণ পরিস্থিতি জারি রেখে হঠাৎ অভিযান চালিয়ে সফলতা পাওয়া সম্ভব নয়। নিঃসন্দেহে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান হিসেবে বিশ্ববিদ্যালয়ের বিশেষ পরিবেশ থাকা বাঞ্ছনীয়, যা আমরা গড়ে তুলতে ব্যর্থ হয়েছি। যেমন চাইলেও রিকশা চলাচল বন্ধ করা যাবে না শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের প্রয়োজনেই। ভবঘুরে ও ভাসমানদের কেবল তাড়িয়ে দেওয়াই সমাধান নয় এবং তা টেকসইও হবে না। এ ধরনের চেষ্টা আগেও দেখা গেছে, তবে সফল হয়নি। বরং বিশ্ববিদ্যালয়ের সামগ্রিক পুনর্গঠনে হাত দেওয়া জরুরি। কেবল উপরিকাঠামোর পরিবর্তনে তাৎপর্যপূর্ণ কিছু পাওয়া যাবে না, যেমনটা ক্যাম্পাসজুড়ে দৃষ্টিনন্দনের নামে গাছপালা কেটে পার্কে পরিণত করা হয়েছে। 

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান হিসেবে শিক্ষা ব্যবস্থার পুনর্গঠন এবং গবেষণা, উদ্ভাবনী ও সৃজনশীলতায় গুরুত্ব দিলে এমনিতেই পারিপার্শ্বিক অবস্থার পুনর্বিন্যাসের প্রয়োজন পড়বে। আর তা কেবল দৃষ্টিনন্দনের উদ্দেশ্যে পরিচালিত হলে বিশ্ববিদ্যালয়ের মূল লক্ষ্য অর্জিত হবে না। তাই চিন্তা পদ্ধতিতে পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে সুন্দর পরিবেশ গড়ে উঠবে বলে আশা করি।  

ইফতেখারুল ইসলাম: সহসম্পাদক, সমকাল 

মন্তব্য করুন


 

Link copied