ডেস্ক: ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শহীদ সার্জেন্ট জহুরুল হক হলের তৃতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী জাহিদ (ছদ্মনাম)। ২০২০ সালে বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রথম বর্ষে ভর্তি হয়ে হলের গণরুমে ওঠে। ক্যান্টিনে তখন তিন বেলা খাবার খেয়ে খরচ হতো ১০০ টাকা। বর্তমানে তিন বেলা খাবার খেতে খরচ হয় ১৫০-১৬০ টাকা।
জাহিদের মতো ঢাবির আবাসিক হলের প্রতিটি শিক্ষার্থীর ক্যান্টিনের খাবার খেতে এমন টাকা খরচ করতে হচ্ছে। তিন বছরের ব্যবধানে ক্যান্টিনে খাবারের দাম বৃদ্ধি পেয়েছে ৪০-৫০ শতাংশ। অনেক শিক্ষার্থী খরচের বিষয়ে চিন্তা করে দুই বেলার খাবারও খাচ্ছেন।
বিভিন্ন হলের ক্যান্টিনে সরেজমিনে গিয়ে ও শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, ২০২০ সালে মাছ ও সবজি দিয়ে ভাত খেতে খরচ হতো ২৫ টাকা।
এখন মাছ ও সবজি দিয়ে খেতে খরচ হচ্ছে ৪৫ টাকা। ২০২০ সালে মুরগি দিয়ে ভাত খেতে খরচ হতো ৩০ টাকা। এখন মুরগি দিয়ে খেতে খরচ হয় ৫০ টাকা। ২০২০ সালে গরুর মাংস দিয়ে ভাত খেতে খরচ হতো ৩৫-৪০ টাকা।
এখন গরুর মাংস দিয়ে খেতে খরচ হয় ৬০-৭০ টাকা। ২০২০ সালে শুধু ভাত, ডাল ও সবজি দিয়ে খেতে খরচ হত ১৫-২০ টাকা। এখন ভাত ডাল দিয়ে খেতে খরচ হয় ২০-২৫ টাকা।
খাবারের দাম বৃদ্ধি পেলেও খাবারের মানের কোনো পরিবর্তন হয়নি বলে অভিযোগ শিক্ষার্থীদের। তাদের অভিযোগ, দ্রব্যমূল্যের কথা বলে ক্যান্টিন মালিকরা ইচ্ছে করেই খাবারের দাম বাড়াচ্ছে।
মানের কোনো পরিবর্তন করছে না তারা। এমন খাবার খেয়ে পড়াশোনা করা খুব কষ্টসাধ্য হয় বলে জানান শিক্ষার্থীরা। মার্কেটিং বিভাগের শিক্ষার্থী ইকরাম ভূইয়া বলেন, করোনা মহামারির আগে ৩ হাজার টাকায় পুরো মাস চলে যেত, অথচ এখন ৫ হাজার টাকায়ও মাস শেষ করতে হিমশিম খেতে হচ্ছে। প্রতিনিয়তই খরচ বৃদ্ধি পেলেও আমাদের আয় বৃদ্ধি পাচ্ছে না। সূর্যসেন হলের শিক্ষার্থী রোকনুজ্জামান বলেন, করোনার আগে যেই মুরগি ৩০ টাকায় বিক্রি হতো, এখন ৫০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। প্রায় সবকিছুর দাম দ্বিগুণ হয়ে গেছে। পরিবারের ওপর চাপ বাড়ছে। অথচ খাবারের মান দিন দিন আরো নিচে নামছে। ইসলামের ইতিহাস বিভাগের শিক্ষার্থী সেলিম হোসেন বলেন, প্রতিটি জিনিসের দাম বৃদ্ধি পেলেও আমাদের আয়ের পরিমাণ বৃদ্ধি পায়নি। আগে একটা টিউশন করেই মাস শেষ করতে পারতাম, সেখানে এখন দুটো টিউশন করতে হচ্ছে। আগে ৩০-৩৫ টাকায় দুপুরের খাবার হয়ে যেত, সেখানে এখন ৫৫-৬০ টাকায় খেতে হচ্ছে।
এদিকে ক্যান্টিন মালিকরা বলছেন ভিন্ন কথা। তাদের দাবি, বাজারের সবকিছুর দাম বেড়েছে, তাই বাধ্য হয়েই খাবারের দাম বাড়াতে হচ্ছে। এছাড়া বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষও কোনো ভর্তুকি দিচ্ছেন না। জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান হল ক্যান্টিনের মালিক আবু জাফর বলেন, দ্রব্যমূল্য যেভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে আমরা সেভাবে চাইলেও দাম বৃদ্ধি করতে পারছি না। আগে ৩-৪ হাজার টাকা বেতনে কেন্টিনে কাজ করার মতো লোক পেতাম, এখন ৬ হাজারের নিচে কেউ কাজ করছে না। বাকি খাওয়ার প্রবণতা সবচেয়ে বড় বাধা। আমরা চাইলেও বাকির এই টাকাগুলো উদ্ধার করতে পারছি না।
মাস্টারদা সূর্যসেন হল ক্যান্টিন মালিক মো. ফাহিম বলেন, জিনিসপত্রের দাম বৃদ্ধি পেয়ে দ্বিগুণ হয়ে গেছে। এর মধ্যে প্রতি দিন ৩০-৩৫ জনকে বাকি খাওয়াতে হয়, যাদের মধ্যে ১০ জনের বেশির টাকা পাওয়া যায় না। রুমে রুমে দৈনিক ৪০ টার মতো খাবার যায় যেগুলো থেকে ২০ টার দামও পাওয়া যায় না। এই বাকি টাকাগুলো উদ্ধার করার জন্য হল প্রশাসনকে অনুরোধ করলেও তাদের থেকে কোনো কার্যকরী পদক্ষেপ পাওয়া যায় না।
মাস্টারদা সূর্যসেন হল প্রাধ্যক্ষ অধ্যাপক ড. জাকির হোসেন ভূঁইয়া বলেন, দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির ফলেই ক্যান্টিন মালিকরা বাধ্য হয়েই খাবারের দাম বৃদ্ধি করছে। তবে খাবারের মান উন্নয়নের জন্য আমরা কাজ করে যাচ্ছি। কেন্টিনে ভর্তুকি দেওয়া হবে কিনা, এই প্রশ্নে তিনি বলেন, এই বিষয়ে আমাদের কোনো এখতিয়ার নেই। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন চাইলেই এমন পদক্ষেপ নিতে পারে।
শহীদ সার্জেন্ট জহুরুল হক হলের প্রাধ্যক্ষ অধ্যাপক ড. মো. আবদুর রহিম বলেন, আমরা কেন্টিনে গ্যাস বিল, কারেন্ট বিল, টেবিল চেয়ার এবং প্লেট হলের পক্ষ থেকে দিয়ে থাকি। এছাড়া কেন্টিনের মান এবং পরিবেশ উন্নয়নের জন্য নিয়মিত কাজ করে যাচ্ছি। যারা ফ্রি খাচ্ছে বা বাকি টাকা দিচ্ছে না, তাদের বিরুদ্ধেও আমরা ব্যবস্থা নিচ্ছি, তবে অনেক ক্ষেত্রে মালিকরা ভয়ের জায়গা থেকে তাদের নাম প্রকাশ করতে চায় না। আর খাবারে ভর্তুকি দেওয়ার বিষয়টি আমাদের হাতে নেই, এটা সরকারিভাবে দেওয়া হলে তবেই সম্ভব।