আজ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শোক দিবস। কালের আবর্তনে আবারও ফিরে এসেছে এই দিন। ঠিক ৩৮ বছর আগের কথা। ১৯৮৫ সালের ১৫ অক্টোবর। দিনটি ছিল মঙ্গলবার। ২০২৩ সালের অক্টোবরের মতোই সেই অক্টোবরেও বৃষ্টি হচ্ছিল দেশ জুড়ে । সে দিনও ছিল গুঁড়িগুঁড়ি বৃষ্টি। দিন পেরিয়ে শহরে নেমেছে সন্ধ্যার অন্ধকার। তখন বাইরে হালকা বৃষ্টি। শিক্ষার্থীরা সারা দিনের কর্মব্যস্ততা শেষে ফিরেছেন হলে। কেউ পড়তে বসেছেন। কেউ ডাইনিং-এ রাতের খাবার খাচ্ছেন। কেউবা হলের টিভি রুমে ‘শুকতারা’ ধারাবাহিক নাটক দেখার অপেক্ষায় বসে আছেন। তখন ঘড়ির কাঁটায় রাত ৮টা কিংবা সাড়ে ৮টা। এমনি মুহূর্তে হঠাৎ এক বিকট শব্দ। থেমে যায় বিশ্ববিদ্যালয়ের জগন্নাথ হলের সব গতিপ্রকৃতি। স্তব্ধ হয়ে যায় সব কিছু। বাতাসে ভেসে আসে শত শিক্ষার্থীর ক্রন্দন ধ্বনি। ক্রমেই ভারী হয়ে ওঠে শহরের আকাশ-বাতাস। আজও সেই দুর্বিষহ রাতের স্মৃতি বয়ে বেড়ান বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা। আহতরা আতকে ওঠেন সেই রাতের কথা ভেবে।
জগন্নাথ হলের অ্যাসেম্বলি হাউজে সেদিন রাতে কী ঘটতে যাচ্ছে জানে না কেউই। অ্যাসেম্বলি হাউজ ভবনের অডিটোরিয়ামটি তখন জগন্নাথ হলের টিভি রুম হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। চুন, সুরকি দিয়ে করা অডিটোরিয়ামের ছাদ কিছুটা নড়বড়ে। তৎকালীন সময়ে সেই অডিটোরিয়ামকে ঝুঁকিপূর্ণ ঘোষণা করে বন্ধ করে দেওয়া হয়। বেগম মমতাজ হোসেন রচিত ‘শুকতারা’ ধারাবাহিক নাটক বেশ জনপ্রিয় তখন। প্রতি মঙ্গলবার বাংলাদেশ টেলিভিশনে প্রচার হতো এই ধারাবাহিক নাটকটি। সেই নাটক দেখতেই সেদিন শিক্ষার্থীরা ধীরে ধীরে জড়ো হন অ্যাসেম্বলি হাউজ অডিটোরিয়ামে। সাদা কালোর সেই জামানায় জগন্নাথ হলের টিভি ছিল রঙিন। রঙিন টিভিতে নাটক দেখতে শিক্ষার্থীরা আরও বেশি আনন্দ পেতেন। তাই তো নাটক শুরু হওয়ার আগেই কানায় কানায় পূর্ণ হয়ে যায় সেদিন অডিটোরিয়াম। নাটক তখন শুরু হয়েছে। আর অন্যদিকে বৃষ্টিতে ভিজে চুন, সুরকির ছাদ ভারী হয়ে গেছে। কেউ কিছু বুঝে ওঠার আগেই হঠাৎ ছাদ ভেঙে পড়ে শতাধিক শিক্ষার্থীর ওপর। সেই এক করুণ পরিণতি। সেই রাতে হাসপাতাল থেকে একে একে বেরিয়ে আসে ৩৫টি মরদেহ। সেই রাতেই আহতদের সেবা-শুশ্রূষা করতে করতেই মারা যান শান্তি প্রিয় চাকমা নামে এক শিক্ষার্থী। তিনি হিসাব বিজ্ঞান বিভাগের দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্র তখন। আহতদের মধ্য থেকে পরবর্তী আরও পাঁচ জন নিহত হয়। মৃত্যুর সংখ্যা দাঁড়ায় ৪০। সেদিন আহত হয়েছে তিন শতাধিক মানুষ।
সেই দুর্ঘটনায় আহতদের মধ্যে ছিলেন বিশ্ববিদ্যালয়ের বর্তমান রেজিস্ট্রার প্রবীর কুমার সরকার। তিনি মাথায় প্রচণ্ড আঘাত পেয়েছেন। বাম হাতে রড ঢুকে গিয়েছিল। সুস্থ হয়ে ক্যাম্পাসে ফিরতে প্রায় সাত মাস সময় লেগে যায়। তিনি তখন বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থী। সেই সময়ের স্মৃতিচারণ করে তিনি ইত্তেফাককে বলেন, ধারাবাহিক শুকতারা নাটকে আমাদের হলের দুই শিক্ষার্থী অভিনয় করে। এক জনের নাম শুভ্রদেব অন্যজন আমার বন্ধু মন্ময় অধিকারী। স্বাভাবতই আমাদের মধ্যে এই নাটক দেখার আগ্রহ বেশি ছিল। তখন অ্যাসেম্বলি ভবনে সংস্কার কাজ চলছিল। নাটক শুরু হওয়ার কিছুক্ষণ আগে গিয়ে আমি টিভি রুমে বসি। ওপর থেকে বৃষ্টির পানি ফোটা ফোটা মাথায় পড়ছিল। তখন ভাবলাম উঠে যাব। ততক্ষণে নাটক শুরু হওয়ায় আর ওঠা হয়নি। তারপর একটি বিকট শব্দ। ওপর দিকে তখন তাকিয়ে দেখছিলাম মাথার ওপর ছাদটি ভেঙে পড়ছে। তার কিছুক্ষণ পরে বুঝলাম আমি শরীরটা নাড়াতে পারছি না। মনে হচ্ছে শরীর রড জাতীয় কিছুর সঙ্গে আটকে আছি। ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে মানুষ যেভাবে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিয়েছে, তা এক কথায় অভূতপূর্ব।
জগন্নাথ হল প্রভোস্ট অধ্যাপক ড. মিহির লাল সাহা তখন জগন্নাথ হলের আবাসিক ও উদ্ভিদবিজ্ঞান বিভাগের মাস্টার্সের শিক্ষার্থী। ঐ দিনের স্মৃতিচারণ করে তিনি বলেন, আমি মৃত্যুর হাত থেকে দুই বার বেঁচে ফিরেছি। একবার ’৭১ সালে পাকিস্তানি বাহিনীর হাত থেকে। আরেক বার ১৯৮৫ সালের ১৫ অক্টোবর। আমি ছিলাম নর্থ হলে। গোবিন্দ চন্দ্র দেব ভবনে। আমরা বন্ধুরা মিলে সেদিন শুকতারা দেখার পরিকল্পনা নিয়েই হল থেকে বের হই। রাতের খাবার শেষে টিভি রুমের দিকে যাচ্ছিলাম। তখন আমার মিডটার্ম পরীক্ষা চলছিল। পরীক্ষার কথা চিন্তা করে আমি নাটক দেখবো না বলে হলে চলে আসি। আমার বন্ধুরাও নাটক না দেখে রুমে ফিরে আসে। তার কিছুক্ষণ পরেই শুনতে পেলাম হলের টিভি রুমের ছাদ ভেঙে পড়েছে। আশপাশের সবাই সে দিন সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিয়েছে। আহতদের রক্ত দিতে সেদিন হসপিটালে সিরিয়াল লেগে যায়। তিনি বলেন, প্রতি বছর ১৫ অক্টোবর স্মরণে জগন্নাথ হল নানা আয়োজন করে থাকে। এই বছর চিত্রাঙ্কন ও রচনা প্রতিযোগিতার আয়োজন করা হয়েছে। এছাড়া প্রতি বছর একটি স্মরণিকা বের করা হয়। সেখানে আহত ও প্রত্যক্ষদর্শীরা তাদের অভিজ্ঞতাগুলো শেয়ার করে থাকে।